আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র: মাওলানা আলিম উদ্দিন পীর সাহেব (১৯১৬–২০২৬) ও তাঁর তরিকতের খেদমত
পরিচিতি ও বংশপরিচয়
দক্ষিণ চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক আকাশে এক ধ্রুবতারা হিসেবে দীপ্তমান ছিলেন মহান মুর্শিদে বরহক মাওলানা আলিম উদ্দিন পীর সাহেব উখিয়া। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ বাংলার কক্সবাজার মহকুমার উখিয়া থানার ডিগলিয়া পালং গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে শিক্ষা ও তাসাউফ তরিকত সুফিবাদ প্রচার ব্রত ছিলেন।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা
প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের মুরুব্বিদের সান্নিধ্যে শিক্ষার হাতেখড়ি হওয়ার পর তিনি উখিয়া এমদাদুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা থেকে উচ্চতর অ্যাকাডেমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। বহু প্রথিতযশা ওস্তাদ ও স্বীয় পীরের কাছ থেকে ইলমে দ্বীন অর্জনের পর তিনি আধ্যাত্মিক জগতের দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি কাদেরিয়া মোজাদ্দেদিয়া তরিকার ১৯তম খেলাফতপ্রাপ্ত পীর হিসেবে ভূষিত হন।
তাঁতের তরিকতের সিলসিলা অত্যন্ত বরকতময় ও প্রাচীন। তাঁর পীর ছিলেন হযরত আব্দুস সালাম আরকানী (রহ.) এবং তাঁর পীর ছিলেন হযরত হাফেজ হামেদ হাসান আজমগড়ী (রহ.)। এভাবেই এই সিলসিলা সরাসরি মুজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। উত্তর প্রদেশের আজমগড়ের বাসিন্দা হযরত শাহ মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.) ১৯০০ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩৯ বছর তরিকতের প্রচার ও প্রসারে নিরলস সফর করেন। তাঁর ৪৪ জন খলিফার মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ১৬ জন খলিফা নিয়োজিত ছিলেন। গারাংগিয়ার বড় হুজুর ও ছোট হুজুর কেবলা এবং আরাকানী হযরত আব্দুস সালামের মতো মহামানুষদের ধারায় মাওলানা আলিম উদ্দিন উখিয়া-বান্দরবান ও পার্বত্য অঞ্চলে এই সিলসিলাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক সংস্কার
ইসলামিক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং জাহেরি-বাতেনি জ্ঞান বিতরণে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন লিখেছেন অনেক দুর্ভেদ্য তাসাউফ ও সুফিবাদ তরিকতের বই-পুস্তক ।
তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
* উখিয়া উপজেলার টাইপালং হামিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা
* রামু উপজেলার থিমছড়ি হামিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা
* গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ার হায়াতুন্নবী তাহফীজুল কোরআন মাদ্রাসা
* মংডু আরকান সালামিয়া হামিদিয়া খানেকা ও ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র
* বান্দরবান নাইক্ষ্যংছড়ির খানেকা হামেদিয়া হেফজখানা ও জামে মসজিদ কমপ্লেক্স, চাকঢালা
* ঈদগাহ খানেকায়ে রহমানিয়া, কক্সবাজার
* নাইক্ষ্যংছড়ির হায়াতুনব্বী হাফেজখানা, চেরারমাঠ
* সালামী পাড়া জামে মসজিদ তাহফিজ একাডেমী, নাইক্ষ্যংছড়ি
পাশাপাশি, সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি বেশ কিছু এলাকার নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করেন—হামিদিয়াপাড়া, সালামিয়াপাড়া ও মেহেরপুর (নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন)। একাধারে শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক ও তাসাউফ ও সুফিবাদের আধ্যাত্মিক রাহবার হিসেবে তিনি আমৃত্যু মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। ভক্ত, মুরিদান ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, তিনি জীবদ্দশায় ৭০ বারের বেশি পবিত্র হজ পালন করেছেন এবং মহানবী (সা.)-কে বহুবার স্বপ্নে দেখেছেন বলে রেওয়ায়েত রয়েছে। অত্যন্ত পরহেজগার ও কামেল পীর হিসেবে তিনি সমগ্র অঞ্চলে পরিচিত ছিলেন।
জানাজা ও ওফাত
গত ৩০ আগস্ট ২০২৬, রবিবার রাত ১০টা ২০ মিনিটে উখিয়ার নিজ বাসভবন বায়তুস সালামে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের আধ্যাত্মিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁর একমাত্র সাহেবজাদা ও বর্তমান খেলাফতপ্রাপ্ত পীর মাওলানা আহমদ হোসাইন।
জানাজায় ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত ছিলেন—অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী (জেলা জামায়াতের আমীর), মাওলানা হাফিজুল ইসলাম নিজামী (সাবেক অধ্যক্ষ, চুনতি আলিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম), মাওলানা একে এম আবুল হাসান আলী (সাবেক অধ্যক্ষ, রাজাপালং ফাজিল মাদ্রাসা, উখিয়া), কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা শাহজালাল চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সরোয়ার জাহান চৌধুরী এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীসহ হাজার হাজার ভক্ত, মুরিদ ও সর্বস্তরের জনসাধারণ।
তিনি পেছনে রেখে গেছেন তাঁর একমাত্র সাহেবজাদা এবং অগণিত ভক্ত, মুরিদ ও খলিফা। তাঁর উল্লেখযোগ্য খলিফাদের মধ্যে এর রয়েছেন—মরহুম হাফেজ শামসুল হক, শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ নূর, মাওলানা আহমদ হোসাইন (পীরজাদা, উখিয়া) ও মাওলানা হুসাইন আহমদ আরকানি প্রমুখ।

লেখক: আবু তাহের মাসুম
গবেষক, বিশ্লেষক ও আধ্যাত্মিক সুফিবাদী সংস্কারকদের জীবন ও কর্ম
তথ্যসূত্রঃ ভক্ত মুরিদান, লিখিত বই পুস্তক, পরিবার ব্যক্তি বর্গ বক্তব্য।
নিজস্ব সংবাদ : 













