ঢাকা ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
উখিয়া-টেকনাফে মাদকবিরোধী হুঁশিয়ারি যেন ‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ না হয় ভারতে উচ্চস্বরে আজান দেয়ায় মুয়াজ্জিন গ্রেপ্তার, মসজিদের মাইক জব্দ হে সৈকত, হে শৈশব, ডাকি ক্ষণে ক্ষণে। দূর প্রবাসে তোমার ঢেউ, আমার প্রাণে বাজে। কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নতুন ভিসি প্রফেসর ড. মোকতার আহমেদ চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ, সিজারের ছয় মাস পর প্রাণ গেল নার্স বিথীর পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির দুধ পান করে ১৯ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। প্রতি বুধবার কোর্টবাজার অরিজিন হাসপাতালে রোগী দেখবেন ও অপারেশন করবেন শিশু সার্জন ও ইউরোলজিস্ট বার্ন)রিকনস্ট্রাকটিভ ও কসমোটিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ শরীয়তপুর পৌরসভার ধানুকা এলাকায় জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে এ চুরির ঘটনা ঘটে। দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে সোনার পাড়ায় জালিয়াপালং ইউনিয়ন (উত্তর শাখা) বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত বিশ্ববাজারে আবারও কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম।

উখিয়া-টেকনাফে মাদকবিরোধী হুঁশিয়ারি যেন ‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ না হয়

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৮:৫০:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
  • 7

 

সীমান্তবর্তী মানুষের প্রত্যাশা ও একান্ত ভাবনা

 দুই উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন এই দুই উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। মাদক ও ইয়াবা পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি জ্বালানি, সার, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের কারণ।

মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও এসব অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কেন? সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পরও মাদক পাচারের ঝুঁকি কেন রয়ে গেছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে উখিয়া ও টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী কঠোর বক্তব্য জনমনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে সেই প্রত্যাশা যেন শেষ পর্যন্ত কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’—প্রবাদটির তাৎপর্য

‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’—বাংলা ভাষার বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ। এর মর্মার্থ হলো, যার বাস্তব সক্ষমতা বা কার্যকর ভূমিকা নেই, সে অনেক সময় কথার জোরে নিজের শক্তি প্রকাশের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত যোগ্যতা ও সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায় কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে নয়।

‘তর্জন’ বলতে হুমকি, ভর্ৎসনা বা ক্রোধ প্রকাশ বোঝায়। ‘গর্জন’ হলো উচ্চকণ্ঠে শক্তি প্রদর্শন। আর ‘সার’ বলতে এখানে মূল নির্যাস বা শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রবাদটি ফাঁকা আস্ফালন ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে।

ইংরেজিতেও একটি পরিচিত প্রবাদ রয়েছে—“All that glitters is not gold”; অর্থাৎ চকচক করলেই সোনা হয় না। একইভাবে, উচ্চকণ্ঠে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করলেই কোনো সমস্যার সমাধান নিশ্চিত হয় না। বরং ঘোষণার বাস্তবায়ন, ধারাবাহিকতা ও ফলাফলই দায়িত্বশীলতার প্রকৃত মাপকাঠি।

উখিয়া-টেকনাফের মাদক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রবাদটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

দুই থানার ওসির কঠোর ঘোষণা

সম্প্রতি মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ ও ঘোষণার কথা সামনে এসেছে। একই ধারাবাহিকতায় উখিয়া ও টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

গত ১৭ আগস্ট উখিয়া থানার উদ্যোগে উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের খাদিজাতুল কোবরা বালিকা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ‘মাদককে না বলুন’ প্রতিপাদ্যে একটি মাদকবিরোধী র‍্যালি ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতির বক্তব্যে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, “হয় মাদক ছাড়বেন, না হয় উখিয়া ছাড়বেন। হয় জেলখানায় যাবেন, না হয় মাদক ছেড়ে দেবেন।”

তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং মাদক ব্যবসা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, একই দিন টেকনাফ পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আয়োজিত মাদকবিরোধী র‍্যালি-পরবর্তী বক্তব্যে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।

দুই থানার ওসির এমন বক্তব্যকে স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ, মাদকের ভয়াবহতা থেকে সীমান্তবর্তী জনপদকে রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই কঠোর ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যাবে? মাদকবিরোধী বক্তব্যের পর মাঠপর্যায়ে অভিযান কতটা জোরদার হবে? বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি বড় কারবারি, অর্থের জোগানদাতা এবং পুরো পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

বাহক নয়, নেপথ্যের কারবারিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে

মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবল মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহের উৎস, অর্থের জোগান, পরিবহনব্যবস্থা, মজুতকেন্দ্র এবং নেপথ্যে থাকা সংগঠকদের শনাক্ত করা জরুরি।

দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উখিয়া-টেকনাফ হয়ে পরিবাহিত বলে সন্দেহ করা ইয়াবার চালান আটকের ঘটনা সামনে আসে। এসব ঘটনায় বাহক বা পরিবহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও সংশ্লিষ্ট চালানের অর্থদাতা ও মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা গেছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে ছোট পর্যায়ের কারবারিরা ধরা পড়লেও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় কিছু ব্যক্তির জীবনযাত্রা ও সম্পদে অল্প সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন। কারও ব্যক্তিগত গাড়ি, দামি মোটরসাইকেল, বড় বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু কারও সম্পদ বা জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখেই তাঁকে মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। প্রয়োজনীয় প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন কিংবা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইন অনুযায়ী সম্পদের উৎস ও অর্থনৈতিক লেনদেন তদন্ত করা।

মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে অর্থের উৎস অনুসন্ধান, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং আন্তসংস্থা সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মাদকের বাজার টিকিয়ে রাখে শুধু বাহক নয়; এর পেছনে অর্থ, যোগাযোগ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের একটি কাঠামোও কাজ করে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

সীমান্তবর্তী জনপদে মাদকবিরোধী অভিযান কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিবেচনায় কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেলে কোনো কোনো অপরাধী দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও উদ্বেগজনক। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করে আনতে হবে।

একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযানের স্বচ্ছতা, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।

কোনো মাদক কারবারি রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করলে তাঁর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি। প্রশাসনের দৃঢ়তা প্রমাণিত হবে তখনই, যখন অপরাধের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি

বাংলাদেশে মাদক নির্মূলে বিভিন্ন সময়ে কঠোর অবস্থান, বিশেষ অভিযান ও শূন্য সহনশীলতার নীতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার ও ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রয়োজন কার্যকর কৌশল নির্ধারণ। শুধু মাদক উদ্ধার কিংবা গ্রেপ্তারের সংখ্যাকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। বরং মাদকের সরবরাহ কমেছে কি না, বড় নেটওয়ার্ক ভেঙেছে কি না, পুনরায় অপরাধের প্রবণতা কমেছে কি না এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করতে হবে।

সীমান্তে নজরদারি জোরদার, গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তদন্ত, পাচারের রুট শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা কঠিন।

একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। মাদক সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর উদ্যোগ না থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যেতে পারে।

প্রয়োজন বক্তব্যের নয়, ফলাফলের প্রমাণ

উখিয়া ও টেকনাফের দুই থানার ওসি মাদকবিরোধী অভিযানে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে তথ্যদাতার নিরাপত্তা, অভিযোগের গোপনীয়তা এবং তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল র‍্যালি, সভা, হুঁশিয়ারি কিংবা সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না থাকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করা, পরিবহন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, বড় চালানের নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ অর্থের উৎস অনুসন্ধানে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে।

একইভাবে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পাচারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব পণ্যের অবৈধ পাচার হলে কৃষক, সাধারণ ভোক্তা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মাদক ও পণ্য পাচার—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত নজরদারি অপরিহার্য।

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে শুধু ছোটখাটো কারবারিদের গ্রেপ্তার করে মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে ‘গডফাদার’ আখ্যা দেওয়াও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা।

শেষ কথা

উখিয়া-টেকনাফের মানুষ মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জনপদ দেখতে চান। তাঁরা চান, মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধ বাস্তব অভিযানে রূপ নিক। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসন একযোগে কাজ করুক।

‘হাতি-ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়া বলে কত জল’—এই প্রবাদটি বড় ও জটিল সংকট মোকাবিলার বাস্তবতা অনুধাবন না করে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অসংগতি তুলে ধরে। উখিয়া-টেকনাফের মাদক পরিস্থিতিও এমন একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানে শুধু কঠোর বক্তব্য নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সাহসী সিদ্ধান্ত, নিরপেক্ষতা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

দুই থানার ওসির কঠোর হুঁশিয়ারিকে তাই আমরা স্বাগত জানাই। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ যেন শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত না হয়। তাঁদের ঘোষণার সার্থকতা প্রমাণিত হোক মাদক পাচার কমার মধ্য দিয়ে, বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এবং সীমান্তবর্তী জনপদে মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

লেখক: এম আর আয়াজ রবি

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, কক্সবাজার জেলা প্রেসক্লাব, কক্সবাজার।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

উখিয়া-টেকনাফে মাদকবিরোধী হুঁশিয়ারি যেন ‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ না হয়

উখিয়া-টেকনাফে মাদকবিরোধী হুঁশিয়ারি যেন ‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ না হয়

আপডেট সময় ০৮:৫০:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

 

সীমান্তবর্তী মানুষের প্রত্যাশা ও একান্ত ভাবনা

 দুই উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন এই দুই উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। মাদক ও ইয়াবা পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি জ্বালানি, সার, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের কারণ।

মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও এসব অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কেন? সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পরও মাদক পাচারের ঝুঁকি কেন রয়ে গেছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে উখিয়া ও টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী কঠোর বক্তব্য জনমনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে সেই প্রত্যাশা যেন শেষ পর্যন্ত কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’—প্রবাদটির তাৎপর্য

‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’—বাংলা ভাষার বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ। এর মর্মার্থ হলো, যার বাস্তব সক্ষমতা বা কার্যকর ভূমিকা নেই, সে অনেক সময় কথার জোরে নিজের শক্তি প্রকাশের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত যোগ্যতা ও সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায় কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে নয়।

‘তর্জন’ বলতে হুমকি, ভর্ৎসনা বা ক্রোধ প্রকাশ বোঝায়। ‘গর্জন’ হলো উচ্চকণ্ঠে শক্তি প্রদর্শন। আর ‘সার’ বলতে এখানে মূল নির্যাস বা শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রবাদটি ফাঁকা আস্ফালন ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে।

ইংরেজিতেও একটি পরিচিত প্রবাদ রয়েছে—“All that glitters is not gold”; অর্থাৎ চকচক করলেই সোনা হয় না। একইভাবে, উচ্চকণ্ঠে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করলেই কোনো সমস্যার সমাধান নিশ্চিত হয় না। বরং ঘোষণার বাস্তবায়ন, ধারাবাহিকতা ও ফলাফলই দায়িত্বশীলতার প্রকৃত মাপকাঠি।

উখিয়া-টেকনাফের মাদক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রবাদটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

দুই থানার ওসির কঠোর ঘোষণা

সম্প্রতি মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ ও ঘোষণার কথা সামনে এসেছে। একই ধারাবাহিকতায় উখিয়া ও টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

গত ১৭ আগস্ট উখিয়া থানার উদ্যোগে উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের খাদিজাতুল কোবরা বালিকা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ‘মাদককে না বলুন’ প্রতিপাদ্যে একটি মাদকবিরোধী র‍্যালি ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতির বক্তব্যে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, “হয় মাদক ছাড়বেন, না হয় উখিয়া ছাড়বেন। হয় জেলখানায় যাবেন, না হয় মাদক ছেড়ে দেবেন।”

তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং মাদক ব্যবসা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, একই দিন টেকনাফ পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আয়োজিত মাদকবিরোধী র‍্যালি-পরবর্তী বক্তব্যে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।

দুই থানার ওসির এমন বক্তব্যকে স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ, মাদকের ভয়াবহতা থেকে সীমান্তবর্তী জনপদকে রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই কঠোর ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যাবে? মাদকবিরোধী বক্তব্যের পর মাঠপর্যায়ে অভিযান কতটা জোরদার হবে? বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি বড় কারবারি, অর্থের জোগানদাতা এবং পুরো পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

বাহক নয়, নেপথ্যের কারবারিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে

মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবল মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহের উৎস, অর্থের জোগান, পরিবহনব্যবস্থা, মজুতকেন্দ্র এবং নেপথ্যে থাকা সংগঠকদের শনাক্ত করা জরুরি।

দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উখিয়া-টেকনাফ হয়ে পরিবাহিত বলে সন্দেহ করা ইয়াবার চালান আটকের ঘটনা সামনে আসে। এসব ঘটনায় বাহক বা পরিবহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও সংশ্লিষ্ট চালানের অর্থদাতা ও মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা গেছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে ছোট পর্যায়ের কারবারিরা ধরা পড়লেও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় কিছু ব্যক্তির জীবনযাত্রা ও সম্পদে অল্প সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন। কারও ব্যক্তিগত গাড়ি, দামি মোটরসাইকেল, বড় বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু কারও সম্পদ বা জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখেই তাঁকে মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। প্রয়োজনীয় প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন কিংবা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইন অনুযায়ী সম্পদের উৎস ও অর্থনৈতিক লেনদেন তদন্ত করা।

মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে অর্থের উৎস অনুসন্ধান, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং আন্তসংস্থা সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মাদকের বাজার টিকিয়ে রাখে শুধু বাহক নয়; এর পেছনে অর্থ, যোগাযোগ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের একটি কাঠামোও কাজ করে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

সীমান্তবর্তী জনপদে মাদকবিরোধী অভিযান কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিবেচনায় কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেলে কোনো কোনো অপরাধী দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও উদ্বেগজনক। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করে আনতে হবে।

একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযানের স্বচ্ছতা, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।

কোনো মাদক কারবারি রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করলে তাঁর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি। প্রশাসনের দৃঢ়তা প্রমাণিত হবে তখনই, যখন অপরাধের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি

বাংলাদেশে মাদক নির্মূলে বিভিন্ন সময়ে কঠোর অবস্থান, বিশেষ অভিযান ও শূন্য সহনশীলতার নীতির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচার ও ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন প্রয়োজন কার্যকর কৌশল নির্ধারণ। শুধু মাদক উদ্ধার কিংবা গ্রেপ্তারের সংখ্যাকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। বরং মাদকের সরবরাহ কমেছে কি না, বড় নেটওয়ার্ক ভেঙেছে কি না, পুনরায় অপরাধের প্রবণতা কমেছে কি না এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করতে হবে।

সীমান্তে নজরদারি জোরদার, গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তদন্ত, পাচারের রুট শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা কঠিন।

একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। মাদক সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর উদ্যোগ না থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যেতে পারে।

প্রয়োজন বক্তব্যের নয়, ফলাফলের প্রমাণ

উখিয়া ও টেকনাফের দুই থানার ওসি মাদকবিরোধী অভিযানে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে তথ্যদাতার নিরাপত্তা, অভিযোগের গোপনীয়তা এবং তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল র‍্যালি, সভা, হুঁশিয়ারি কিংবা সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না থাকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করা, পরিবহন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, বড় চালানের নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ অর্থের উৎস অনুসন্ধানে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে।

একইভাবে, ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পাচারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব পণ্যের অবৈধ পাচার হলে কৃষক, সাধারণ ভোক্তা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মাদক ও পণ্য পাচার—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত নজরদারি অপরিহার্য।

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে শুধু ছোটখাটো কারবারিদের গ্রেপ্তার করে মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে ‘গডফাদার’ আখ্যা দেওয়াও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা।

শেষ কথা

উখিয়া-টেকনাফের মানুষ মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জনপদ দেখতে চান। তাঁরা চান, মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধ বাস্তব অভিযানে রূপ নিক। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসন একযোগে কাজ করুক।

‘হাতি-ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়া বলে কত জল’—এই প্রবাদটি বড় ও জটিল সংকট মোকাবিলার বাস্তবতা অনুধাবন না করে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অসংগতি তুলে ধরে। উখিয়া-টেকনাফের মাদক পরিস্থিতিও এমন একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানে শুধু কঠোর বক্তব্য নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সাহসী সিদ্ধান্ত, নিরপেক্ষতা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

দুই থানার ওসির কঠোর হুঁশিয়ারিকে তাই আমরা স্বাগত জানাই। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—‘অসারের তর্জন-গর্জনই সার’ যেন শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত না হয়। তাঁদের ঘোষণার সার্থকতা প্রমাণিত হোক মাদক পাচার কমার মধ্য দিয়ে, বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এবং সীমান্তবর্তী জনপদে মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

লেখক: এম আর আয়াজ রবি

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, কক্সবাজার জেলা প্রেসক্লাব, কক্সবাজার।