পাওয়ার পলিটিক্সের পুনরাবৃত্তি যেন না হয
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত ১৭ বছর নানা বিতর্ক, মতবিরোধ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, দলীয়করণের অভিযোগ, ভিন্নমত দমন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অনেকের মতে, এই সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক বা পাওয়ার পলিটিক্স-নির্ভর। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল, ভিন্নমতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হতো না এবং সমালোচনা সহ্য করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এক ধরনের অনীহা বা ভয়ভীতি কাজ করতে থাকে। এ সময় অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়েও দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর সংকট তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে, যা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নীতিনির্ভর না হয়ে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো সরকারেরই অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিটি সময়ই নতুন সুযোগ নিয়ে আসে, যেখানে পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও উন্নত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তাই বর্তমান সরকারের প্রতিও প্রত্যাশা থাকবে—ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ যে পথ অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, সেই পথে আবার হাঁটলে একই ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়, যা দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গণতন্ত্রে সমালোচনা শত্রুতা নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়ও বটে। গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণযোগ্য হলে তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত, কারণ এর মাধ্যমে নীতিগত ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে অযৌক্তিক সমালোচনার জবাব যুক্তি ও তথ্য দিয়ে দেওয়াই একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয়। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তখনই একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দিকে অগ্রসর হয়।
এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য সংলাপ ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সংঘাত ও বিভাজনের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে দুর্বল করে দেয়, যেখানে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা একটি টেকসই পথ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলে জাতীয় সংকট মোকাবিলা করা অনেক সহজ হয়। বিশেষ করে নির্বাচন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক নীতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলা একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে জনগণের আস্থা, দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং সংঘাতের চেয়ে সংলাপকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তরুণ প্রজন্ম আজ আরও সচেতন, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বৈশ্বিক চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত। তাদের প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে তারা নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে এবং রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে।
একটি শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও। নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষমতার অপব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। যদি ক্ষমতার রাজনীতি থেকে সরে এসে জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশ স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে। সুন্দর গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই হতে পারে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তি, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারবে।
লেখক: আব্দুল্লাহ আল যোবাইর,
সম্পাদক কারেন্ট নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম।
নিজস্ব সংবাদ : 
















