শিক্ষক বাতায়ন কিংবা পাঠ্যপুস্তক—সবখানেই আমরা বলি শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা সেই মেরুদণ্ডকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছি? আজকের এই আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের কারিগর হলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষকরা। একজন শিক্ষা শ্রমিক বা শিক্ষক কেবল পাঠদানই করেন না, বরং একটি প্রজন্মকে মূল্যবোধ আর জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষকরা প্রাপ্য সম্মান এবং জীবনযাত্রার নূন্যতম মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন মানেই শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন। একজন শিক্ষক যখন আর্থিক চিন্তা ও সামাজিক অমর্যাদাবোধ থেকে মুক্ত থাকেন, তখনই তিনি তার সেরাটা শিক্ষার্থীদের দিতে পারেন। শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমার বিনীত আবেদন করে সম্ভাব্য করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করছি-
১. সম্মানজনক বেতন কাঠামো ও বৈষম্য দূরীকরণ করতে পারলেই বর্তমান সরকারকে বিগত সরকারের চেয়ে অধিকতর যোগ্য ও শিক্ষাবান্ধব সরকারে ভূষিত করবে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে যে বিশাল বেতন বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করা যেতে পারে।
২.শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক এবং আকর্ষণীয় স্বতন্ত্র পে-স্কেল ঘোষণা করা উচিত, যা তাদের সামাজিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষকতা-ই একমাত্র পেশা, যেখানে দুর্নীতি বা চুরি-চামারি করার কোন সুযোগই নেই। নির্দিষ্ট বেতন নিয়েই Hand to Mouth হিসেবে তাদের সংসার চালাতে হয়।
৩.বেসরকারি শিক্ষকদের নামমাত্র বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পরিবর্তন করে বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের মতো তিন বছর পর পর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা চালু করা যেতে পারে।
৪.দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। এ বৃহৎ শিক্ষক গোষ্ঠীর জীবনমান নিশ্চিতে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান বলে মনে করি। এতে শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও মর্যাদা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি গরীব-অসহায় শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রীয় সুবিধার অংশীজন হবে। জুলাই আন্দোলনের সুফল হিসেবে শিক্ষায় ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর হবে।
৫.শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নে দেশি ও বিদেশি উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষকদের M.Phil, Ph.D বা উচ্চতর গবেষণার জন্য বিশেষ অনুদান ও শিক্ষা ছুটির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৬.ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষকদের আইসিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। ক্ষেত্রবিশেষে ল্যাপটপ প্রদান এবং আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহারের পূর্ণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। শ্রেণিকক্ষকে চিত্তাকর্ষক করতে এবং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সেটআপ করা যেতে পারে।
৭. আবাসন প্রকল্পের আওতায় শিক্ষকদের জন্য পল্লী বা আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করুন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে স্বল্প মুনাফায় বা কর্জে হাসানায় ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৮.স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষকদের জন্য স্বল্প প্রিমিয়ামে বা বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করা। উন্নত চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা হিসেবে প্রয়োজনে শিক্ষকদের জন্য আলাদা হাসপাতাল নির্মাণ করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৯. সামাজিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ও প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ করে তাঁদেরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। চিকিৎসক বা অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো শিক্ষকদের জন্য ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা যেতে পারে। এই আইনের অধীনে কোনো শিক্ষককে তুচ্ছ কারণে বা বিনা তদন্তে লাঞ্ছিত করা, বরখাস্ত করা বা শারীরিক ও মানসিকভাবে অপদস্থ করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
১০. শিক্ষকদের বদলি, পদোন্নতি বা এমপিও (MPO) সংক্রান্ত কাজগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয় করা। এতে করে শিক্ষা অফিসগুলোতে শিক্ষকদের সশরীরে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হবে না। নানা অজুহাতে ঘুষের হয়রানি থেকে রেহাই পেতে পারেন।
তাছাড়াও শিক্ষকদের সব ধরনের দাপ্তরিক কাজের জন্য জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা।
১১. পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধা ত্বরান্বিত করা খুবই অত্যাবশ্যক। অনেক সময় শিক্ষকরা অবসরের পর তাদের পাওনা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। এই প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল ও দ্রুততর করা উচিত যাতে শেষ জীবনে তারা আর্থিক কষ্টে না পড়েন।
১২.দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে শিক্ষকদের জন্য এমন একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হোক, যাতে তাদের দৈনন্দিন অভাবের চিন্তায় লজ্জিত হতে না হয়। এতো কার্ডের ভীড়ে শিক্ষকদের জন্যও আলাদা কার্ড ভাতা এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
১৩.বর্তমানে বাংলাদেশের সিংহভাগ শিক্ষা কার্যক্রম বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (এমপিওভুক্ত) মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবুও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাহাড়সম বৈষম্য বিদ্যমান। বেসরকারি ও সরকারি পর্যায়ের বৈষম্য কমিয়ে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে শিক্ষা বিভাগকে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা যায়।
১৪.কর্মক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষক যেন তুচ্ছ কারণে লাঞ্ছিত বা অপদস্থ না হন, সেদিকে কঠোর আইনি নজরদারি প্রয়োজন। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে এমন একটি ‘অভিযোগ ও প্রতিকার সেল’ গঠন করা, যেখানে শিক্ষকরা তাদের সাথে হওয়া যেকোনো বৈষম্য বা হয়রানির কথা সরাসরি এবং পরিচয় গোপন রেখে জানাতে পারবেন। এই সেলটি কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার অধীনে না হয়ে একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার অধীনে হতে পারে।
১৫. রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও মর্যাদা পুনর্বিন্যাস করতে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট, সম্মানজনক আসন সংরক্ষিত রাখা গেলে মর্যাদা সমুন্নত হবে। ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স (Warrant of Precedence)-এ শিক্ষকদের অবস্থান তাদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বর্তমানের চেয়ে সম্মানজনক স্তরে উন্নীত করা যেতে পারে।
১৬. শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নিমিত্ত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। তুচ্ছ প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে শিক্ষকদের কারণ দর্শানো (Show cause) বা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
১৭. কাজী কাদের নেওয়াজের সেই বিখ্যাত “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা” কবিতার শিক্ষকের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, সেভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারণা চালানো। পাঠ্যপুস্তকে এবং গণমাধ্যমে শিক্ষকদের অবদানের কথা তুলে ধরা যাতে সমাজ ও প্রশাসনের নিম্নস্তর পর্যন্ত শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়।
১৮. জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় কনিষ্ঠ কাউকে উপরের পদে বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি পদ্ধতি বজায় রাখা প্রশাসনিক মর্যাদা রক্ষার পূর্বশর্ত।
১৯. শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ‘স্মার্ট কার্ড’ প্রদান করা, যা ব্যবহার করে তারা সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, ট্রেন বা বাস স্টেশনে বিশেষ অগ্রাধিকার এবং ভিআইপি ওয়েটিং রুম ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। এটি সামাজিকভাবে তাদের উচ্চ মর্যাদা প্রদর্শন করবে।
২০.শিক্ষা খাতে জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। শিক্ষকরা যদি অভাবের তাড়নায় নিমজ্জিত থাকে, তবে একটি জাতি কখনোই উন্নত মস্তকে দাঁড়াতে পারবে না।
২১.শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তির পরিবর্তে শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য নিশ্চিত করা। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষকদের উপর অনৈতিক চাপ কমবে।
২২.জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব রাখা এবং রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মাননার পরিধি বাড়ানো। প্রয়োজনে সংসদে নির্দিষ্ট পরিমাণ আসন শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, আমরা শিক্ষকদের প্রতি কেবল মুখে সম্মান নয়, বরং নীতিগত ও আর্থিকভাবে তাদের মর্যাদা সুনিশ্চিত করি। শিক্ষার পেছনে ব্যয় করা অর্থ আসলে ‘খরচ’ নয়, বরং এটি জাতির শ্রেষ্ঠ ‘বিনিয়োগ’। শিক্ষকদের সচ্ছলতা ও সম্মান নিশ্চিত করা গেলে মেধা পাচার (Brain Drain) কমবে এবং দেশ গঠনে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষকদের প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে পারলে সমাজ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রতি অবজ্ঞা দূর হবে।
শিক্ষক বাঁচলে, শিক্ষা বাঁচবে;
শিক্ষা বাঁচলে, দেশ বাঁচবে।
লেখক-এম. জসিম উদ্দিন
প্রভাষক (আরবি) রাজাপালং এমদাদুল উলুম ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা উখিয়া, কক্সবাজার।
ও এম.ফিল (গবেষক) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
নিজস্ব সংবাদ : 










